সার্ভিস চার্জের নামে শতকোটি টাকা দুর্নীতি, সাবেক পরিচালক মো. নাসির উদ্দিনসহ ২২জনের নামে অনুসন্ধান করছে দুদক

সার্ভিস চার্জের নামে শতকোটি টাকা দুর্নীতি, সাবেক পরিচালক মো. নাসির উদ্দিনসহ ২২জনের নামে অনুসন্ধান করছে দুদক

সায়লা শারমিন, বিশেষ প্রতিনিধি : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অমান্য করে হাসপাতালকে বেসরকারি ক্লিনিকের মতো পরিচালনার পাশাপাশি শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাসির উদ্দিন আহমদসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো পরিচালকের এক চিঠির সূত্র ধরেই অনিয়মের এই খবর বেড়িয়ে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজ । মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ৮ জুলাই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাসির উদ্দিন আহমদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি লেখেন। যার স্বারক নং ২৫৮৫৬।

চিঠিতে রোগীদের কাছ থেকে ভর্তি ও বিভিন্ন টেস্ট বাবদ অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। প্রস্তাবে সিটিস্ক্যান ২০০ টাকা, এমআরআই ৫০০ টাকা, আলট্রাসনোগ্রাম ৫৫ টাকা, আলট্রা (সিঙ্গেল) ৫০ টাকা, হাসপাতালের ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগের সব সেবার ওপর ৮ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ আদায় এবং রোগী দর্শনার্থী ফি ২০০ টাকা নির্ধারণ করে আদায় করা হয় । পরিচালকের এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ আগস্ট ২০১৬ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন (মমেকহা ২০১৬/২৫২৯২) জারি করে। প্রজ্ঞাপনে ১০ টাকার অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ নিতে বারণ করা হয় ও আদায়কৃত অর্থ রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ রাখার নির্দেশ জারি করা হয়। কিন্তু পরিচালক মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশ অমান্য করে অতিরিক্ত সার্ভিজ চার্জ আদায় করে শতকোটি টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। এবিষয়ে সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) মোঃ নাসির উদ্দিন,পিবিআইয়ের এডিশনাল এসপি আবুবকর সিদ্দিক,এসআই রুবেল হোসেনসহ ২২ জনের নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রধান কার্যালয় একটি অভিযোগ জমা হয়েছে।

এই অভিযোগের আলোকে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জের বিরোধিতা করেন স্থানীয় দৈনিক ময়মনসিংহ প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক মোঃ খায়রুল আলম রফিক। তিনি বলেন, যেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা হওয়ার কথা, সেখানে জনগণের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কেন? সরকারি হাসপাতালকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ক্লিনিকে পরিণত করা হচ্ছে। তারপর পরিচালক মোঃ নাসির উদ্দিনের নির্দেশে হাসপাতাল ভাঙচুরের অভিযোগ এনে দ্রুত বিচার আইনে সাংবাদিক খায়রুল আলম রফিকের নামে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন খাদ্য সরবরাহ ঠিকাদার হাশেম আলী। মামলাটি তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন পিবিআই ময়মনসিংহের এডিশনাল এসপি আবুবকর সিদ্দিককে। পরবর্তীতে পিবিআইয়ের এডিশনাল এসপি আবুবকর সিদ্দিক ও এসআই রুবেল হোসেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভাঙচুর ও ঠিকাদার হাশেম আলীকে পিটিয়ে হাত ভেঙ্গে দেয় সাংবাদিক এমন মিথ্যা বানোয়াট অভিযোগ এনে ঘটনা সত্যতা পেয়ে বিজ্ঞ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন পিবিআই ।

সাংবাদিক মোঃ খায়রুল আলম রফিককে বিএনপিপন্থী সাংবাদিক উল্লেখ করে তাকে কয়েকবার লাঞ্ছিত ও তার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করে বিচারের দাবি জানিয়েছিলেন আওয়ামী লীগপন্থী ঠিকাদার হাশেম আলীসহ তার লোকজন। তারপর ময়মনসিংহ সদর আদালতে একটি দ্রুত বিচার আইনে মামলা দায়ের করেছেন ২০১৭ সালে। সাবেক পরিচালক ব্রি: জেনারেল মোঃ নাসির উদ্দিন আহমেদের প্রভাব বিস্তার করে মামলাটি একতরফা সাক্ষী দিয়ে সাংবাদিক খায়রুল আলম রফিকের অনুপস্থিতে তিনবছর সাজা প্রদান করেন। পরবর্তীতে সাংবাদিক খায়রুল আলম রফিক স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে আদালত তাকে কারাগারে প্রেরণ করেন। দুইমাস পর উচ্চ আদালত থেকে স্থায়ী জামিনে মুক্তি পান। মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সাবেক পরিচালক নাসির উদ্দিন আহমেদ চাঁদপুরের আওয়ামী লীগের সাবেক এমপির পুত্র । আওয়ামী লীগের আমলে প্রভাব বিস্তার করে দীর্ঘদিন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন।

এ বিষয়ে বিএমএ ময়মনসিংহ শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. এইচ এ তারা গোলন্দাজ বলেন, ‘ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সরকারি প্রতিষ্ঠান। রোগীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করাসহ এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার সব বিষয়ে দেখভাল করা সরকারের চিকিৎসক প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বিএমএর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। দু’বছর ধরে ১০ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ ছাড়াও বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত চার্জ আদায় করা হচ্ছে। দুঃখজনক হলো, এই সরকার ক্ষমতায় এসে হাসপাতালের বার্ষিক বরাদ্দ ৫১ কোটি টাকা বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু পরিচালক সরকারকে কৃতিত্ব না দিয়ে নিজেই এর কৃতিত্ব দাবি করে চলেছেন। আক্ষেপের সুরে এইচ এ তারা গোলন্দাজ বলেন, ‘পরিচালক সব বিষয়ে আমাদের অন্ধকারে রেখে কাজ করে হরিলুট করেছেন। সরকারিভাবে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে সাফিসিয়ান্ট ওষুধ, চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। সেখানে সার্ভিস চার্জের নামে অনৈতিকভাবে জনগণের টাকা চুষছেন পরিচালক। এতে এই সেবাখাতে স্বাস্থ্যবান্ধব সরকারের ইতিবাচক ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালকে বেসরকারি ক্লিনিকে পরিণত করা হয়েছে। হতে পারে উনি অন্য মতের লোক, তাই এসব করছেন। বৈঠকে বিএমএ সভাপতি ডা. মতিউর রহমান ভূইয়া বলেন, ‘সার্ভিস চার্জ নেওয়ার কোনো সরকারি চিঠি নেই। মৌখিক সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ নেওয়া যায় না, বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও শিশু বিভাগের প্রধান ডা. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সরকার উন্নয়ন করে। সরকারের উন্নয়ন বাস্তবায়ন করে কর্মকর্তা কর্মচারীরা। কাজেই হাসপাতালের সব কৃতিত্ব সরকারের, কারো একার বা পরিচালকের নয়। উপ-পরিচালকের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে মো. আনোয়ার বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা উপ-পরিচালকের অফিসে গিয়েছিলাম, কথা হয়েছে। আমি বলেছি, অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ নেওয়া হচ্ছে। উপ-পরিচালক স্বীকার করেছেন, তাদের কিছু ত্রুটি হয়েছে। এগুলো সংশোধন করা হবে। এ বিষয়ে উপ-পরিচালক লক্ষ্মী নারায়ণ দাস বলেন, ‘তারা এসেছিলেন কথা হয়েছে। সার্ভিস চার্জ নেওয়ার বিষয়ে সরকারি কোনো নির্দেশনা বা চিঠি অনুমোদন নাই। স্থানীয়ভাবে নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে কথা বলতে পরিচালকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

( এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। )

Comments are closed.




© All rights reserved © 2024 websitenews24.com